Wednesday, June 10, 2015

গৌর লীলা মাধুরী - অবতারবাদ

অবতারবাদঃ



শ্রীমদ্ভগবত গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের প্রারম্ভে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলিলেন- হে অর্জুন, যে সব তত্ত্ব কথা আমি তোমাকে বলিলাম, পূর্বে আমি এই সমস্ত কথা বিবস্বান বা সূর্যকে বলিয়াছিলাম। বিবস্বান বলিয়াছিলেন তৎপুত্র মনুকে। এই কথা গুলি মনু বলিয়াছিলেন নিজ পুত্র রাজর্ষি ইক্ষ্বাকুকে। এই ভাবে রাজর্ষি পরম্পরায় এই সব কথা চলিয়া আসিতেছিল। কালক্রমে লোকে এইগুলি ভুলিয়া গিয়াছিল। তাই নতূন করিয়া এই সমস্ত কথা আবার তোমাকে বলিলাম।

অর্জুন বিস্মিত হইয়া বলিলেন,  হে কৃষ্ণ,  তোমার জন্ম হইল মাত্র সেদিন অর্থাৎ মনু ইক্ষ্বাকুদের অনেক পরে। আর তোমার জন্মের কতকাল পূর্বে বিবস্বান- মনু- ইক্ষাকুদের আবির্ভাব। তুমি বিবস্বানকে এত সব তত্ত্ব কথা বলিয়াছিলে আমি সে কথা কি করিয়া বিশ্বাস করিব?

উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন- হে অর্জুন, তোমার ও আমার এ জগতে বহুবার আসা হইয়াছে। তুমি সব ভুলিয়া গিয়াছ কিন্তু আমার সবই মনে আছে। কেবল যে পূর্বে বহুবার আসিয়াছি তাহা নয়, মাঝে মাঝে আসিয়া থাকি। যখন ধর্মের গ্লানি হয়, অধর্মের অভ্যুত্থ্যান হয় তখনই আমি আসি। আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই। প্রয়োজন হইলেই আসি।

প্রয়োজনটি হইল ধর্মের সংস্থান। ইহারই জন্য যুগে যুগে কালে কালে শ্রীভগবানের মর্তে আবির্ভাব। গীতায় শ্রীকৃষ্ণের এই উক্তিই হলো অবতার বাদের মূল ভিত্তি।

ভগবানের মানুষ রূপে অবতার গ্রহনের কতকগুলি যুক্তিগত অসুবিধা আছে, আছে কতকগুলি অসামঞ্জস্য। মানুষ জন্ম-মৃত্যুর অধিন, ভগবান জন্ম মৃত্যুর অতীত। মানুষ রূপে অবতীর্ণ হইলে ভগবানকেও জন্ম-মৃত্যুর অধিন হইতে হয়। যুক্তি তর্কের সাহায্যেইহা বোঝা কঠিন।ইহা ছাড়া আপাতঃ অসামঞ্জস্য আছে।মানুষের দেহ পরিনামী। এই দেহ বাল্য, কৈশোর, যৌবন, জরা এই সর্ব পরিবর্তন হয়। ভগবানের দেহ অপরিনামী। তাজাতে বাল্য কৈশোর যৌবন জরা প্রভৃতি বিকার হইতে পারে না। অথচ মানুষ হইয়া আসিলে ভগবানকে এই সব বিকারের অধিন হইতে হয়। এই যুক্তিতে ভগবান মনুষ্য দেহ ধারন করিতে পারে না। অবতারবাদের বিরুদ্ধে এই সকল হইলো জোরালো আপত্তি।

এই আপত্তি গুলোর উত্তর ভগবান নিজেই দিয়েছেন।  বলিয়াছেন অর্জুন কে কিন্তু উদ্দেশ্য করেছেন জগতের সকল মানুষকে।  " আমি অজ হইলেও জন্মগ্রহণ করি। আমি অব্যয়, আমি অপরিবর্তনীয়। কিন্তু অপরিনামী থাকিয়াও আমি দেহ ধারন করি। আমার যোগ মায়া শক্তির প্রভাবে এই সমস্ত কার্য হইয়া থাকে। " যোগমায়া কি রূপ, ইহার ব্যবস্থা কি রূপ,  ইহা বোঝা ও বোঝানো অতিব কঠিন। একটি লৌকিক দৃষ্টান্ত দ্বারা বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা যাইতেছে-

সকাল বেলা সূর্য পূর্ব আকাশে উদিত হয়, সন্ধ্যা বেলা পশ্চিমে অস্ত যায়। ইহা সর্বজন দৃষ্ট,  সর্বজনসম্মত সত্য। কিন্তু বিজ্ঞানের গুনে ইহা সকলেই জানে,  সূর্য্যের উদয় অস্ত বলিয়া কিছু নাই। ইহা সকল সময় একই স্থানে অবস্থান করে।  সূর্য্যের উদয় অস্ত নাই ইহা পরম সত্য- সকল লোকের জানাও সত্য। ভগবান জন্ম মৃত্যুর অতীত ইহাও পরম সত্য। আবার ভগবান নরদেহ ধারন করে আবির্ভূত হন, লীলা করেন ও লীলা সংবরন করেন ইহাও পরম সত্য। ভগবানের চিন্ময় দেহের পরিবর্তন নাই যেমন সূর্য্যের কোন পরিবর্তন নাই। কিন্তু প্রভাত বেলার সূর্যকে আমরা বলি বালার্ক, প্রভাত সূর্য, তরুন তপন। সূর্য কখনো বালক হয় না, তরুন হয় না, নবোদিতও হয় না। সকালে আমরা সূর্য্যের এইেরূপ প্রতক্ষ করি। সেই রূপ ভগবান কখনো বালক হন না, তরুন হন না বা জরাগ্রস্থও হন না। তিনি অব্যয় আত্মা, সর্বভূতের ঈশ্বর। কিন্তু মাতা যশোদার কোলে যখন থাকেন  তখন তাহাকে বলি- বালগোপাল। যখন ব্রজগোপিনীদের সাথে থাকেন,  তকন বলি- নবকিশোর নটবর। এই রহস্য হৃদয়ঙ্গম না হইলে ভগবানের লীলা আস্বাদন করা যায় না।


NEXT 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20


No comments :

No comments :

Post a Comment